জাল সনদের সচিব: বাধ্যতামূলক অবসরে ইউজিসির ফেরদৌস জামান তুহিন
✪ টাইমস অব ক্যাম্পাস ডেস্ক রিপোর্ট :
ইউজিসি দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ। এ ধরনের একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে ফেরদৌস জামান যোগদান করার পর থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত হন। এমনকি একাধিকবার উত্থাপিত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী যথাযথ শাস্তিমূলকব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)-এর বরখাস্ত সচিব ফেরদৌস জামান তুহিনকে এবার বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। গত রোববার ইউজিসির পূর্ণ কমিশনের এক সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। সভায় অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে, সভায় একাধিক কর্মকর্তা এই মর্মে মত দিয়েছেন যে, বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠালে বরিশালের বাকেরগঞ্জের কুলাঙ্গার ফেরদৌস জামানকে গুরুপাপে লঘু দণ্ড দেওয়া হবে। যেহেতু তার নিয়োগ প্রক্রিয়াটাই ভুয়া। জাল অভিজ্ঞতার সনদে তিনি ইউজিসিতে চাকরি পেয়েছেন। নিজের সরকারি কলেজের স্ত্রীকে দিয়ে ফেরদৌস তার ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদ সত্যায়িত করে ইউজিসিতে চাকরির আবেদন করে চাকরি বাগিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতাদের তদবিরে।
এর আগে চলতি বছরের শুরুর দিকে গত প্রায় ১৫ বছর ধরে তার বিরুদ্ধে লুটপাট ও নৈতিক স্খলনের নানা অভিযোগ প্রমাণিত হয় তদন্তে। ফেরদৌস পদোন্নতি বাগিয়েছেন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সনদে। ইউজিসিতে চাকরির সুবাদে যোগ্যতা না থাকলেও নিজের স্ত্রীকে সরকারি কলেজ থেকে পদত্যাগ করিয়ে অধ্যাপক পদে চাকরি দিয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। আরো অনেক অযোগ্য আত্মীয়কে চাকরি দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। গুরুতর অনেকগুলো অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিলো ‘ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং’ কমিটি। কিন্তু গত কয়েকমাস ধরে তিনি তদবির করে গ্রেফতার এড়াতে সক্ষম হন।
প্রায় ১১ মাস আগে করা তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউজিসি দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ। এ ধরনের একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে ফেরদৌস জামান যোগদান করার পর থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত হন। এমনকি একাধিকবার উত্থাপিত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী যথাযথ শাস্তিমূলকব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং বারবার তাকে পদোন্নতি দিয়ে, চাকরি স্থায়ীকরণ করে, বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিয়ে, প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়; যা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক এবং একটি বড় ধরনের প্রশাসনিক বিচ্যুতি, যা চাকুরি শৃঙ্খলার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তাই এই বিষয়ে পূর্ণ কমিশনের সভায় উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানটির মর্যাদা ও ভাবমূর্তি বৃদ্ধি করা আবশ্যক বলে জানানো হয়।
অভিযোগে বলা হয়, ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদ দিয়ে ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে কমিশনের সহকারী সচিব পদে যোগদান করা ফেরদৌস জামান সচিবসহ ইউজিসির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। সর্বশেষ সচিব পদে ছিলেন কয়েকবছর। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর জনরোষের মুখে তাকে অন্যপদে বদলি করা হয়। অন্তবর্তীকালীন সরকারের ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির তদন্তে তার বিরুদ্ধে প্রায় সব অভিযোগ প্রমাণিত। চলতি বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি ফেরদৌসকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বরখাস্তকালে তিনি কমিশনের রিসার্চ গ্রান্টস অ্যান্ড এওয়ার্ড বিভাগের পরিচালক পদে ছিলেন।
ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, মামলায় ফেরদৌস জামান আইনের চোখে পলাতক হলেও তিনি প্রকাশ্যে অবস্থান করছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারির বিরুদ্ধে এ ধরনের গুরুতর ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হলে; অভিযুক্তকে সাময়িক বরখাস্তসহ প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার বিধান রয়েছে। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে ইউজিসি এখনো কারো বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। তাছাড়া মামলাটির ঘটনার সাথে কোনো কোনো অভিযুক্ত কর্মকর্তার সত্যিকার অর্থেই সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এ বিষয়ে প্রশাসনিকভাবেও কোনো তদন্ত করা হয়নি।
প্রসঙ্গত, ফেরদৌস জামান-এর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইউজিসি একটি ‘ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং’ কমিটি গঠন করে ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ৭ অক্টোবর। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ আহবায়ক, জেলা ও দায়রা জজ (উপ-সচিব, লিগ্যাল) নূরনাহার বেগম শিউলী সদস্য-সচিব এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো: আসাদ উদ্দিন কমিটির সদস্য ছিলেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও ইউজিসি কর্মকতাদের আনীত অভিযোগ এবং এ যাবতকালে সাধিত বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের কাজ করে এই ‘ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং’ কমিটি। কমিটির সাচিবিক দায়িত্ব পালনে সহায়তা করেন কমিশনের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. গোলাম মোস্তফা।
ফেরদৌস জামানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে কাগজপত্র, নথি ও প্রমাণ সংগ্রহ করে, বিদ্যমান আইন, বিধি ও নীতিমালা আলোকে তা পর্যালোচনা করে; অভিযোগগুলোর বাপারে সুপারিশ ও পর্যবেক্ষণসহ প্রতিবেদন প্রণয়ন করে এই কমিটি। গত ২০ জানুয়ারি দাখিল করা কমিটির ২৩ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনের কপি দৈনিক আমাদের বার্তার রয়েছে।
প্রথম অভিযোগ হলো, গত জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকালে নিয়মবহির্ভূতভাবে দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ঘোষণা এবং শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশনা দিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছিলেন ইউজিসির তৎকালীন সচিব ফেরদৌস জামান ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আলমগীর।
অভিযোগে বলা হয়- যখন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে, তখন ১৬ জুলাই ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে ইউজিসি সচিব ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান স্বপ্রণোদিত হয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে দেশের সব পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত মেডিক্যাল, টেক্সটাইল, ইঞ্জিনিয়ারিং ও অন্যান্য কলেজসহ সব কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল ত্যাগের নির্দেশনা দেন। এই আদেশের পর শিক্ষার্থীরা হল ছাড়তে শুরু করে এবং তখনই পুলিশ, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতা কর্মীসহ সন্ত্রাসীরা অসংখ্য শিক্ষার্থীর ওপর হামলার সুযোগ পায়। কয়েক হাজার শিক্ষার্থী এই ঘটনায় হতাহতের শিকার হন। এখানে যত শিক্ষার্থী আহত ও নিহত হয়েছেন, এটার দায় কমিশনের সচিব ফেরদৌস জামান এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আলমগীর কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না।
এই অভিযোগের বিষয়ে ‘ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি’ দেখতে পায়, গত বছরের ১৬ জুলাই জারিকৃত পত্র দু’টি সরকার বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে প্রদানের কথা উল্লেখ করা হলেও, কার নির্দেশে করা হয়েছে এমন কোনো তথ্য নথিতে পাওয়া যায়নি। ১৬ জুলাই জারিকৃত পত্র দুটি সম্পূর্ণভাবে আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে জারি করা হয়েছে। কারণ ইউজিসি অ্যাক্ট ১৯৭৩- এর ৫(ম) -ধারায় অনুসারে, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করার এখতিয়ার কমিশনের নেই।
এরকম একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ পত্র জারির পূর্বে কমিশনের কোনো বিশেষ সভা বা পূর্ণ কমিশনের সভার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিৎ ছিল; তাও করা হয়নি। এমনকি এই সিদ্ধান্তটি জারির পর কমিশনের পূর্ণাঙ্গ সভা ডেকে বিষয়টি অবহিত, অনুমোদন এবং নিশ্চিত করা হয়নি। পত্র জারির পূর্বে কমিশনের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগকে বিষয়টি জানানো হয়নি। এমনকি কমিশনের বিভাগীয় প্রধানসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ ধরনের সিদ্ধান্তের বিষয়ে কিছুই জানতেন না। সুতরাং কমিশনের সচিব ফেরদৌস জামান কর্তৃক জারিকৃত পত্রটি এখতিয়ার বহির্ভূত, উদ্দেশ্য প্রণোদিত ও গুরুতর দায়িত্বহীনতার পরিচয় বহন করে। পরবর্তীতে এ বিষয়ে ঢাকার আশুলিয়া থানায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে একটি ফৌজদারি মামলাও হয়। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে ইউজিসি (কর্মচারী) চাকুরী প্রবিধানমালা, ১৯৮৭ এর বিধি ২৩ অনুযায়ী এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ৩(খ)(ঘ) অনুযায়ী ড. ফেরদৌসকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা সমীচীন ছিল বলে মতামত দিয়েছে ‘ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং’ কমিটি।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, ইউজিসির তৎকালীন সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ফেরদৌস জামানের বিরুদ্ধে জনৈক সানোয়ার হোসেন অভিযোগ দায়ের করেন। এ বিষয়ে ২০২২ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উপসচিব ড. মো. ফরহাদ হোসেন কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর অভিযোগগুলো প্রেরণ করে তদন্তপূর্বক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের কথা উল্লেখ করেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ ফেরদৌস জামানের রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপটে অভিযোগগুলো তদন্ত না করে উল্টো তাকে সচিব পদে স্থায়ী করে।
এবিষয়ে কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ইউজিসির তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. কাজী শহীদুল্লাহ অভিযোগ পাওয়ার দিনই পত্রটি মার্ক করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য ড. মুহাম্মদ আলমগীরকে প্রেরণ করেন। অথচ ড. মুহাম্মদ আলমগীর এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, উল্টো অভিযুক্ত ফেরদৌস জামানকে কমিশনের সচিব পদে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়ার কার্যক্রম সম্পন্ন করেন। অভিযোগকরী সানোয়ার হোসেন ফেরদৌস জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনেও একই অভিযোগ দাখিল করলে, দুদক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ২০২২ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২২ খ্রিষ্টাব্দে এ বিষয়ে যথাযথ তদন্তপূর্বক সুপারিশসহ প্রতিবেদন প্রেরণের জন্য ইউজিসি চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করে পত্র প্রেরণ করে। কিন্তু ইউজিসি এবিষয়ে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়, ফেরদৌস জামান ২০০০ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ মে ইউজিসির তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এটিএম জহুরুল হকের আনুকূল্যে অস্থায়ী ভিত্তিতে সহকারী সচিব (৬ষ্ঠ) পদে যোগদান করেন। তবে পরবর্তীতে উপ-পরিচালক এবং অতিরিক্ত পরিচালক পদে নিয়োগের সময় তিনি তার জীবন বৃত্তান্তে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসাবে উল্লেখ করেন। অনৈতিক ও ভুল তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করে এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিজেকে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
এবিষয়ে কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, রাজস্বখাতের কোনো পদে কখনও অ্যাডহক নিয়োগ দেওয়া যায় না। আইন ও বিধি বহির্ভূতভাবে ফেরদৌস জামানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান দাবির স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ নথিতে পাওয়া যায়নি।
চতুর্থ অভিযোগে বলা হয়, ২০০২ খ্রিষ্টাব্দে ইউজিসি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটি পরিদর্শন টিম বগুড়ার পুন্ড্র ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি পরিদর্শনে যান। এসময় ফেরদৌস জামান অনৈতিক ও নিয়ম বহির্ভূতভাবে গাড়ির তেল ও টোল বাবদ অর্থ গ্রহণপূর্বক আত্মসাৎ করেন। এ বিষয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর তা তদন্ত করে ফেরদৌস জামানকে তিরস্কার এবং চেয়ারম্যানের একান্ত সচিবের পদ থেকে কমিশনের অন্য বিভাগে বদলি করে ইউজিসি।
পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়েছে, ফেরদৌস জামান ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নিয়ে সিলেটের লিডিং ইউনিভার্সিটির প্রজেক্ট প্রপোজালের কপি প্রশাসন বিভাগের সাধারণ শাখা থেকে নিজ উদ্যোগে সংগ্রহ করেন এবং তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয়কে সরবরাহ করেন। সে সময় তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি অনুষদ, বিভাগ ও কোর্স সংক্রান্ত সৃজিত অনুমোদনপত্র (যা কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত নয়) লিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেরণের অভিযোগ উত্থাপিত হয়। এই জালিয়াতির বিষয়টি পরবর্তীতে প্রমাণিত হলে ফেরদৌসের একটি ইনক্রিমেন্ট স্থগিত এবং তাকে কঠোরভাবে সর্তক ও তিরস্কার করে ইউজিসি।
লিডিং ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান রাগীব আলীর সঙ্গে ব্যক্তিগত সখ্য থাকায় ফেরদৌস জামান তার অধস্তন কর্মচারীদের মাধ্যমে রাগীব আলীর স্বাক্ষর জাল করে একটি পত্র সৃজন করেন এবং কমিশনের অনুমোদনহীন কিছু সিলেবাসের সৃজিত অনুমোদনপত্র দিয়ে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠান। বিষয়টি গুরুতর দুর্নীতি, জালিয়াতির অপরাধ এবং অসদাচরণের সামিল। এরূপ গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও ইউজিসি তাকে বরখাস্ত বা বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করে শুধু একটি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের শাস্তি আরোপ করায় বিস্ময় প্রকাশ করেছে তদন্ত কমিটি।
ষষ্ঠ অভিযোগ, ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর একটি গবেষণা প্রতিবেদনে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার তালিকায় নাম আসে ফেরদৌসের। কুমিল্লার ব্রিটানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ইউজিসির তৎকালীন অতিরিক্ত পরিচালক ফেরদৌস জামান এর বিরুদ্ধে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ জানায়। তদন্তে এই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় একপর্যায়ে ফেরদৌস জামানকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের ৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এ কে আজাদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অভিযোগের বিষয় পর্যালোচনা করা হলে, তারা কোনো দোষ খুঁজে পায়নি। ফলে সেই সভায় ফেরদৌস জামানের সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সপ্তম অভিযোগে বলা হয়, ইউজিসি-এর সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল মান্নানের মেয়াদকালে ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রস্তাবিত বায়োস্ট্যাটিসটিকস বিভাগে ইউজিসি কর্তৃপক্ষের যথাযথ অনুমোদন ছাড়া স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে জনবল নিয়োগের অনুমোদন দেন ফেরদৌস জামান। ওই অনুমোদনপত্রের বিষয়ে অভিযোগ উত্থাপিত হলে তা বাতিল করে ইউজিসি। কিন্তু ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির পর্যালোচনায় দেখা যায়, বায়োস্ট্যাটিসটিকস বিভাগ নয়। বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ‘থিওরিটিক্যাল অ্যান্ড কমপিউটেশনাল কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট’-নামে একটি নতুন বিভাগ প্রতিষ্ঠার জন্য একাডেমিক পরিষদের সুপারিশ ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের ২১ জুনের সিন্ডিকেট সভায় গৃহীত হয়। ইউজিসির সাথে চিঠি চালাচালির একপর্যায়ে ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ জানুয়ারি বিভাগটির অনুমোদন ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের মাধ্যমে আপতত কাজ শুরুর কথা বলা হয়। তবে সবাইকে অন্ধকারে রেখে বা ভুল বুঝিয়ে পাঁচ জন শিক্ষকসহ আট জনের নিয়োগের জন্য অনুমোদনপত্র দেন ফেরদৌস জামান। এ বিষয়ে অভিযোগ উত্থাপিত হলে ইউজিসি তাৎক্ষণিকভাবে এই নিয়োগের অনুমোদনটি বাতিল করে। তবে আশ্চর্যজনকভাবে এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অত্র অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কিনা তা সুস্পষ্ট করা হয়নি। তবে তাকে ভবিষ্যতে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের কোনো পদের দায়িত্ব দেওয়া সমীচীন হবে না মর্মে সুপারিশ করেছিলো সেই তদন্ত কমিটি।
অষ্টম অভিযোগ হলো, সিলেটের লিডিং ইউনিভার্সিটির ঢাকার মালিবাগের আউটার ক্যাম্পাস থেকে অনৈতিকভাবে ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে প্রতিমাসে বারো হাজার টাকা হারে এবং পরবর্তীতে বিশ হাজার টাকা হারে মাসোহারা নিতেন। রেভিনিউ স্ট্যাম্পের ওপর স্বাক্ষর করে প্রতিমাসে এই টাকা নিতেন তিনি। এই অভিযোগ সংক্রান্ত বিল ভাউচার পর্যালোচনায় করে তদন্ত কমিটির জানায়, ফেরদৌস জামান স্ট্যাম্পের উপর নিজ স্বাক্ষর দিয়ে প্রতি মাসে দশ হাজার থেকে বিশ হাজার পর্যন্ত টাকা গ্রহণ করেছেন। তবে এই টাকা তিনি লিডিং ইউনিভার্সিটি থেকে প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর হিসাবে গ্রহণ করেছেন কিনা তা স্পষ্ট নয়। এ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় হতে তথ্য সংগ্রহ করে যাচাই করা যেতে পারে বলে সুপারিশ করেছে ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি।
নবম অভিযোগটি হলো, লিডিং ইউনিভার্সিটির আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্ত করার জন্য ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে কমিশন কর্তৃক একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটিকে ম্যানেজ করার জন্য ফেরদৌস জামানের সঙ্গে অনৈতিকভাবে আর্থিক লেনদেন করেছে বলে জানা যায়।
দশম অভিযোগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দাওয়া অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক আবু জাফর খানের অনৈতিক ও নিবর্তনমূলক কাজের প্রতিকার চেয়ে এক ব্যক্তি ইউজিসিতে আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন বিষয়টি তদন্ত করার জন্য তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। যার অন্যতম সদস্য ছিলেন ফেরদৌস জামান। তিনি তদন্ত কমিটির সদস্য হিসাবে প্রভাব খাটিয়ে আবু জাফর খানের পক্ষে প্রতিবেদন দিয়ে দেন এবং পরবর্তীতে সপরিবারে মালয়েশিয়া ভ্রমণের সুবিধা আদায় করেন, যা নিয়ে ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ জুলাই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
১২তম অভিযোগ, কমিশনের দায়িত্বশীল পদে থেকে এবং প্রভাব বলয় সৃষ্টির মাধ্যমে ফেরদৌস জামান তার বড় বোনের ছেলে ইমরুল কায়েসকে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে শাখা কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দিয়েছেন। এছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনাল, সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরো কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি তার নিকট আত্মীয়দের চাকরি পেতে সহায়তা করেছেন। এছাড়া তিনি ইউজিসি সচিবের অতিরিক্ত দায়িত্ব পাবার পর থেকে সব শ্রেণির নিয়োগে (বিশেষ করে তৃতীয় ও চুতর্থ শ্রেণি) প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে বরিশালের লোকদের চাকরি দিয়েছেন। তবে এসব বিষয়ে অধিকতর তদন্ত হতে পারে বলে জানায় ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি।
১৩তম অভিযোগে বলা হয়, কমিশন সচিবের অতিরিক্ত দায়িত্ব ও সচিব হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে ইউজিসি কর্তৃপক্ষের ওপর প্রভাব খাটিয়ে ফেরদৌস জামান বেপরোয়াভাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট ও অর্থ কমিটিসহ বিভিন্ন নিয়োগ কমিটিতে স্ব-প্রণোদিত হয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এমনকি তিনি নিজেকে অধ্যাপক হিসেবেও পরিচয় দিচ্ছেন, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
তবে এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ফেরদৌস জামান বরাবরের মতোই নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।
Reporter Name 









