০১:৪৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ২৩ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

​শিক্ষা ক্যাডারের ৫০০ কর্মকর্তা লেকচার পাবলিকেশনের ‘গোপন বেতনভুক’: নেপথ্যে ৫ হাজার কোটি টাকার গাইড বাণিজ্য

  • Reporter Name
  • সময় ১০:৪৭:৫২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৫৮ ভিউ হয়েছে

​✪ নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় জেঁকে বসেছে ৫ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল অবৈধ গাইড বই বাণিজ্য। এই ব্যবসার মূল শক্তি হিসেবে কাজ করছেন শিক্ষা ক্যাডারের পাঁচ শতাধিক কর্মকর্তা, যারা গোপনে মাসিক বেতনের বিনিময়ে লেকচার পাবলিকেশনে কাজ করছেন। সরকারি কর্মকর্তাদের এই অশুভ আঁতাত এবং ‘প্রকাশনা মাফিয়া’র সিন্ডিকেটে জিম্মি হয়ে পড়েছে কোটি কোটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ।

​পাঠ্যবইয়ের কৃত্রিম সংকট ও পাণ্ডুলিপি ফাঁস জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) টানা দেড় দশক ধরে বছরের শুরুতে সব বই পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছে। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষেও মাধ্যমিকের ৬০ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী অন্তত একটি বই থেকে বঞ্চিত। অথচ সরকারি বই না থাকলেও বাজারের লাইব্রেরিগুলো নিষিদ্ধ গাইড বইয়ে সয়লাব।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, লেকচার পাবলিকেশন এনসিটিবির অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে মুদ্রণের ‘র’ কপি ও সিলেবাসের তথ্য আগাম সংগ্রহ করে নেয়। ফলে ১ জানুয়ারির আগেই তাদের গাইড বই বাজারে পৌঁছে যায়।
​কর্মকর্তাদের গোপন সংশ্লিষ্টতা ও বৈঠক সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, সরকারি চাকরিতে বহাল থেকেই শিক্ষা ক্যাডারের অন্তত ৫০০ কর্মকর্তা লেকচার পাবলিকেশনের নোট ও গাইড বই লিখে দিচ্ছেন। গত ১৫ ডিসেম্বর এনসিটিবি ভবনে গাইড ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কিছু কর্মকর্তার গোপন বৈঠকের খবরও পাওয়া গেছে। এই সিন্ডিকেটকে সুরক্ষা দিতে এনসিটিবির ভেতর থেকেই কাজ করে একটি বিশেষ চক্র।

​ঘুষের রাজত্ব ও শিক্ষকদের কমিশন গাইড বইয়ের বাজার নিশ্চিত করতে দেশজুড়ে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ঘুষ ও কমিশন বাবদ বরাদ্দ রেখেছে বিতর্কিত এই প্রকাশনী সংস্থাটি। রাজধানীর নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিটির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা। স্কুলের শিক্ষকরা ক্লাসে শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট প্রকাশনীর ‘সহায়ক বই’ কেনার জন্য তালিকা ধরিয়ে দিচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অভিভাবক আক্ষেপ করে বলেন, “স্কুলের চাপে আমরা এই বাড়তি আর্থিক বোঝা বইতে বাধ্য হচ্ছি।”

​অভ্যন্তরীণ অনিয়ম ও অর্থ পাচার প্রতিষ্ঠানের সাবেক পরিচালক আজহারুল ইসলাম এই বিশাল অবৈধ লেনদেন ও বিদেশে অর্থ পাচারের তথ্য জেনে যাওয়ায় তাকে মাত্র ৫ মিনিটের নোটিশে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, তার পাসপোর্ট ও ব্যক্তিগত নথি আটকে রেখে তাকে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে।

​পরিকল্পিত বিলম্বের ষড়যন্ত্র চলতি শিক্ষাবর্ষে বই পৌঁছাতে দেরির নেপথ্যে ‘রিটেন্ডার’ বা পুনরায় দরপত্র আহ্বানকে একটি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির বইয়ের ক্ষেত্রে ৩ মাস এবং নবম শ্রেণির কার্যাদেশ আড়াই মাস অযথা আটকে রাখা হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, বরং গাইড ব্যবসায়ীদের বিক্রির সুযোগ করে দেওয়ার এক পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।

​বিপন্ন সৃজনশীলতা ও আইনি সীমাবদ্ধতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, নোট-গাইড নির্ভরতা শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করছে। ২০০৮ সালে হাইকোর্ট নোট-গাইড নিষিদ্ধ করে ৭ বছরের কারাদণ্ডের বিধান করলেও এর কোনো প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না। প্রশাসনের চোখের সামনেই শিক্ষা ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এই ৫ হাজার কোটি টাকার অন্ধকার কারবার।

​এবিষয়ে লেকচার পাবলিকেশন লিঃ-এর তিনটি ফোন নাম্বারে যোগাযোগের চেষ্টা করলে সেইসব নাম্বারগুলো বন্ধ পাওয়া যায়।

ড. ইউনুস সহ সব উপদেষ্টার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিতে আইনি নোটিশ

​শিক্ষা ক্যাডারের ৫০০ কর্মকর্তা লেকচার পাবলিকেশনের ‘গোপন বেতনভুক’: নেপথ্যে ৫ হাজার কোটি টাকার গাইড বাণিজ্য

সময় ১০:৪৭:৫২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩ জানুয়ারী ২০২৬

​✪ নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় জেঁকে বসেছে ৫ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল অবৈধ গাইড বই বাণিজ্য। এই ব্যবসার মূল শক্তি হিসেবে কাজ করছেন শিক্ষা ক্যাডারের পাঁচ শতাধিক কর্মকর্তা, যারা গোপনে মাসিক বেতনের বিনিময়ে লেকচার পাবলিকেশনে কাজ করছেন। সরকারি কর্মকর্তাদের এই অশুভ আঁতাত এবং ‘প্রকাশনা মাফিয়া’র সিন্ডিকেটে জিম্মি হয়ে পড়েছে কোটি কোটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ।

​পাঠ্যবইয়ের কৃত্রিম সংকট ও পাণ্ডুলিপি ফাঁস জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) টানা দেড় দশক ধরে বছরের শুরুতে সব বই পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছে। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষেও মাধ্যমিকের ৬০ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী অন্তত একটি বই থেকে বঞ্চিত। অথচ সরকারি বই না থাকলেও বাজারের লাইব্রেরিগুলো নিষিদ্ধ গাইড বইয়ে সয়লাব।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, লেকচার পাবলিকেশন এনসিটিবির অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে মুদ্রণের ‘র’ কপি ও সিলেবাসের তথ্য আগাম সংগ্রহ করে নেয়। ফলে ১ জানুয়ারির আগেই তাদের গাইড বই বাজারে পৌঁছে যায়।
​কর্মকর্তাদের গোপন সংশ্লিষ্টতা ও বৈঠক সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, সরকারি চাকরিতে বহাল থেকেই শিক্ষা ক্যাডারের অন্তত ৫০০ কর্মকর্তা লেকচার পাবলিকেশনের নোট ও গাইড বই লিখে দিচ্ছেন। গত ১৫ ডিসেম্বর এনসিটিবি ভবনে গাইড ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কিছু কর্মকর্তার গোপন বৈঠকের খবরও পাওয়া গেছে। এই সিন্ডিকেটকে সুরক্ষা দিতে এনসিটিবির ভেতর থেকেই কাজ করে একটি বিশেষ চক্র।

​ঘুষের রাজত্ব ও শিক্ষকদের কমিশন গাইড বইয়ের বাজার নিশ্চিত করতে দেশজুড়ে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ঘুষ ও কমিশন বাবদ বরাদ্দ রেখেছে বিতর্কিত এই প্রকাশনী সংস্থাটি। রাজধানীর নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিটির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা। স্কুলের শিক্ষকরা ক্লাসে শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট প্রকাশনীর ‘সহায়ক বই’ কেনার জন্য তালিকা ধরিয়ে দিচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অভিভাবক আক্ষেপ করে বলেন, “স্কুলের চাপে আমরা এই বাড়তি আর্থিক বোঝা বইতে বাধ্য হচ্ছি।”

​অভ্যন্তরীণ অনিয়ম ও অর্থ পাচার প্রতিষ্ঠানের সাবেক পরিচালক আজহারুল ইসলাম এই বিশাল অবৈধ লেনদেন ও বিদেশে অর্থ পাচারের তথ্য জেনে যাওয়ায় তাকে মাত্র ৫ মিনিটের নোটিশে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, তার পাসপোর্ট ও ব্যক্তিগত নথি আটকে রেখে তাকে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে।

​পরিকল্পিত বিলম্বের ষড়যন্ত্র চলতি শিক্ষাবর্ষে বই পৌঁছাতে দেরির নেপথ্যে ‘রিটেন্ডার’ বা পুনরায় দরপত্র আহ্বানকে একটি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির বইয়ের ক্ষেত্রে ৩ মাস এবং নবম শ্রেণির কার্যাদেশ আড়াই মাস অযথা আটকে রাখা হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, বরং গাইড ব্যবসায়ীদের বিক্রির সুযোগ করে দেওয়ার এক পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।

​বিপন্ন সৃজনশীলতা ও আইনি সীমাবদ্ধতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, নোট-গাইড নির্ভরতা শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করছে। ২০০৮ সালে হাইকোর্ট নোট-গাইড নিষিদ্ধ করে ৭ বছরের কারাদণ্ডের বিধান করলেও এর কোনো প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না। প্রশাসনের চোখের সামনেই শিক্ষা ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে এই ৫ হাজার কোটি টাকার অন্ধকার কারবার।

​এবিষয়ে লেকচার পাবলিকেশন লিঃ-এর তিনটি ফোন নাম্বারে যোগাযোগের চেষ্টা করলে সেইসব নাম্বারগুলো বন্ধ পাওয়া যায়।