✪ কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি:
নিয়মিত বাজার মনিটরিং ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা না থাকায় ঢাকার কেরানীগঞ্জে এলপি গ্যাসের বাজার কার্যত সাধারণ মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। সরকারি ও কোম্পানি নির্ধারিত মূল্যকে তোয়াক্কা না করে অসাধু ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো দাম বাড়িয়ে একপ্রকার নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ১২ কেজির একটি গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ১২০০ থেকে লাফিয়ে বেড়ে ২০০০ থেকে ২১০০ টাকায় ঠেকেছে।
রান্নার মতো অতি প্রয়োজনীয় জ্বালানির এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে কেরানীগঞ্জের আরশিনগর, ওয়াশপুর, বছিলা, আটি বাজার, কলাতিয়া, রোহিতপুর, হাসনাবাদ, আগানগর, কালিন্দী, জিঞ্জিরা ও শুভাঢ্যা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, একই কোম্পানির গ্যাস একেক দোকানে একেক দামে বিক্রি হচ্ছে। কোথাও ১৯৫০ টাকা, আবার পাশের দোকানেই ২১০০ টাকা। অধিকাংশ দোকানে কোনো মূল্য তালিকা নেই, কোথাও থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। ক্রেতারা দাম জানতে চাইলে খুচরা বিক্রেতারা সাফ জানিয়ে দিচ্ছেন— ‘নিতে হলে এই দামেই নিতে হবে’।
খুচরা বিক্রেতারা দায় চাপাচ্ছেন বড় ডিলার ও পরিবেশকদের ওপর। তাদের ভাষ্য, বেশি দামে কিনতে হওয়ায় বাধ্য হয়েই দাম বাড়ানো হচ্ছে। অন্যদিকে ডিলাররা বলছেন, কোম্পানি থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়া ও পরিবহনসহ আনুষঙ্গিক খরচ বেড়ে যাওয়াই সমস্যার মূল কারণ।
স্থানীয় ভোক্তাদের অভিযোগ, এটি কোনো স্বাভাবিক সংকট নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা একটি কৃত্রিম সংকট। সব এলাকায় প্রায় একই সময়ে দাম বৃদ্ধি, সাপ্লাই কমে যাওয়া এবং ‘গ্যাস নেই’ বলে ভোক্তাদের ভয় দেখানো— সব মিলিয়ে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেটের কারসাজির দিকেই ইঙ্গিত করছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের বাইরে গ্যাস বিক্রি দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও কেরানীগঞ্জে তার কোনো কার্যকর প্রয়োগ চোখে পড়ছে না। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান না থাকায় ব্যবসায়ীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
কেরানীগঞ্জ মডেল থানার শাক্তা ইউনিয়নের হিজলা স্কুলের পাশে সজল স্টোরের মালিক খুচরো গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রেতা সমশের আলি জানান, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ডিলারের নিকট হতে গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে বিক্রি করে আসছি। কিন্তু এখন কোনো ডিলারের কাছেই গ্যাস পাচ্ছি না। গ্যাসের কথা বললেই গ্যাস নাই বলে সাফ জানিয়ে দেয়।
কেরানীগঞ্জ এলপি গ্যাস ডিলার সমিতির সভাপতি নুর আলম আখি গণমাধ্যমকে বলেন, সারা দেশের এলপি গ্যাস কোম্পানিগুলো গ্যাস আমদানিতে সমস্যায় পড়েছে। ফলে আমাদের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস দিচ্ছে না। দিনের পর দিন মংলায় আমাদের গাড়ি বসে থাকে কিন্তু গ্যাসের খবর নাই। যেখানে আগে আমাকে ৮ হাজার বোতল গ্যাস দেওয়া হতো, এখন সেখানে মাত্র ২৫০০ থেকে ৩০০০ বোতল দেওয়া হচ্ছে। ডিলারশিপ চালাতে আনুষঙ্গিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় আগের মূল্যের সঙ্গে ৫০ থেকে ১০০ টাকা বাড়তি নিয়ে আমরা সমন্বয় করছি। কিন্তু খুচরা ব্যবসায়ীরা মাত্রাতিরিক্ত লাভ করায় বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে।
বসুন্ধরা এলপি গ্যাস কোম্পানির ডেপুটি ম্যানেজার (সেলস) রুকুনুজ্জামান গণমাধ্যমকে জানান, গত ১৩ দিন ধরে আমরা কোনো গ্যাস সিলিন্ডার সরবরাহ করতে পারছি না। দেশের বেশিরভাগ এলপি গ্যাস কোম্পানিরই একই অবস্থা। আমাদের কাছে যে পরিমাণ গ্যাস ছিল, তা সরকার নির্ধারিত দামেই সরবরাহ করা হয়েছে। শীতের কারণে চাহিদা বেড়েছে, তার সঙ্গে আমদানিতে বিভিন্ন সংকট সৃষ্টি হওয়ায় এই পরিস্থিতি।
এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. উমর ফারুক গণমাধ্যমকে বলেন, গ্যাস সিলিন্ডার সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে জনভোগান্তির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। শিগগিরই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।
সচেতন মহলের মতে, নিয়মিত বাজার মনিটরিং ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান না থাকলে এই লুটপাট বন্ধ হবে না। দ্রুত সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে সরকার নির্ধারিত দামে গ্যাস বিক্রি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। অন্যথায় রান্নার আগুনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্ষোভের আগুনও যে জ্বলে উঠবে, সে আশঙ্কা করছেন অনেকে।
Reporter Name 









