মুহাম্মদ এস. ইসলাম:
রাজধানী ঢাকায় ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে পাঁচ ধরনের নকশা অনুমোদনের শর্ত দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বিল্ডিং কোড অনুসরণ করে স্থাপত্য, কাঠামোগত, ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল ও প্লাম্বিং নকশা জমা দিলে তবেই ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিতে পারে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)।
রাজধানী ঢাকায় ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে পাঁচ ধরনের নকশা অনুমোদনের শর্ত দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বিল্ডিং কোড অনুসরণ করে স্থাপত্য, কাঠামোগত, ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল ও প্লাম্বিং নকশা জমা দিলে তবেই ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিতে পারে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। আর এর ব্যত্যয় হলে অর্থাৎ নিয়ম ভেঙে ভবন নির্মাণ হলে আইনের আওতায় আনা হবে সংশ্লিষ্ট স্থপতি, প্রকৌশলী, নগর পরিকল্পনাবিদ, ডিপ্লোমা প্রকৌশলীসহ রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। সম্প্রতি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে জারি হওয়া ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০২৫ বিষয়ক প্রজ্ঞাপনে এসব বলা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ভবন নির্মাণ করতে হলে পর্যায়ক্রমে তিনটি ধাপ অনুসরণ করতে হবে। প্রথমে প্ল্যানিং বা পরিকল্পনার অনুমোদন নিতে হবে। এরপর কনস্ট্রাকশন বা নির্মাণের অনুমোদন নিতে হবে। সবশেষে নিতে হবে অকুপেন্সি বা বসবাসের সনদ। এক্ষেত্রে আবেদনকারী নিজে কিংবা প্রতিনিধির মাধ্যমে আবেদন করতে পারবেন। তবে আবেদনের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে অনলাইনে।
পরিকল্পনা অনুমোদনের আবেদন করতে হবে ভবন নির্মাণের আবেদনের আগে। আবেদনের জন্য ভূমি মালিকের জাতীয় পরিচয়পত্র, হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন কর, দলিল, সর্বশেষ নামজারির খতিয়ান ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য কাগজের স্ক্যান কপি জমা দিয়ে ফি পরিশোধ করতে হবে। যথাযথ কাগজপত্র অনলাইনে জমা দেয়ার ৩০ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে অনুমোদন কিংবা যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে বাতিল করবে রাজউক। এক্ষেত্রে আবেদনকারীর আপিলের সুযোগ থাকবে।
রাজউক থেকে পরিকল্পনা অনুমোদন পেলেই নির্মাণ শুরু করা যাবে না। নির্মাণকাজের জন্য পৃথকভাবে অনুমোদন নিতে হবে। এক্ষেত্রে জমা দিতে হবে পাঁচ ধরনের নকশা। বিল্ডিং কোড অনুসরণ করে স্থাপত্য, কাঠামোগত, ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল ও প্লাম্বিং নকশা জমা দিয়ে অনুমোদনের আবেদন করা যাবে। পাশাপাশি জমা দিতে হবে বিশেষ অগ্নিনিরাপত্তা ও নির্বাপণ নকশাও। এই দফা অনুমোদন পাওয়া গেলে নির্মাণকাজ শুরু করা যাবে।
এরপর নির্মাণকাজ তদারকির জন্য রাজউকের নির্ধারিত পরিদর্শক ছাড়াও সংশ্লিষ্ট স্থাপতি, প্রকৌশলী, পরিকল্পনাবিদ ও ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের দায়িত্বও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ভবন নির্মাণের প্রতিটি স্তরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার স্বাক্ষর ছাড়া পরবর্তী কার্যক্রমে যাওয়ার সুযোগ নেই। কোনো স্তরে যদি ভবন মালিক বা সংশ্লিষ্ট কেউ নিয়মের ব্যত্যয় করে তাহলে পেশাদার স্থপতি, প্রকৌশলী, পরিকল্পনাবিদ, ইমারত পরিদর্শক—যাদের স্বাক্ষর থাকবে তারা এজন্য দায়ী থাকবেন।
রাজধানীতে ভবন নির্মাণে স্বচ্ছতা আনতে সরকারের এমন সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। স্থপতি ইকবাল হাবিব সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, ভবন নির্মাণের জবাবদিহির সঙ্গে যেন পেশাদারদের যুক্ত করা হয়। এছাড়া নির্মাণসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নকশাও যেন রাজউকে জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে। এসব বিষয় এবারের বিধিমালায় যুক্ত হয়েছে। মোটের ওপর নিয়মের ব্যত্যয় করে ভবন নির্মাণ ঠেকাতে সিদ্ধান্তটি ভালো।’
ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় পাঁচ কাঠার ওপরে নির্মিত ভবনে পৃথক সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) স্থাপনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বলা হয়েছে, কোনো ভবন যদি পাঁচ কাঠা বা এর বেশি পরিমাণ ভূমির ওপর নির্মাণ করা হয় তাহলে সেখানে আলাদা করে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে। এ বিষয়টির সমালোচনা করেছেন স্থপতি ইকবাল হাবিব। তার মতে, ‘পয়োনিষ্কাশনের কাজ ওয়াসার। ওয়াসার দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা ও দুর্নীতি ঢাকতে সরকার এটা জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। পাঁচ কাঠা জায়গার মধ্যে তো মানুষ আলাদা করে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা স্থাপন করতে পারবে না। মানুষ যেখানে সেপটিক ট্যাংকই বানায় না, সেখানে পৃথক এসটিপি কতটুকু বাস্তবসম্মত, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।’
এবারের বিধিমালায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারি ফি বাড়ানো হয়েছে। ইমারত নির্মাণের নকশা অনুমোদন, সময় বাড়ানো ও ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রের ফি আগে ছিল ১ হাজার টাকা। এখন সেটি বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। এছাড়া ব্লকভিত্তিক আবাসিক ইউনিট নির্মাণ আবেদনের ক্ষেত্রে প্রতি কাঠায় নতুন করে ৫ হাজার টাকা ফি আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি আবাসিক ভবন নির্মাণের অনুমোদন নিতে প্রতি বর্গমিটারে ফি দিতে হবে ৫০ টাকা। বাণিজ্যিক ও শিল্প-কারখানার ক্ষেত্রে প্রতি বর্গমিটারে এই ফি হতে পারে ১৫০ টাকা পর্যন্ত। মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডার মতো ধর্মীয় উপাসনালয়ের ক্ষেত্রে ফি না লাগলেও এসব স্থাপনার কোনো অংশ অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না।
ইমারত নির্মাণ বিধিমালা সম্পর্কে নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান জানান, ‘যে উদ্দেশ্যে ঢাকায় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা প্রয়োজন ছিল, এবারের বিধিমালায় তা ফুটে ওঠেনি। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা মূলত ড্যাপ ও বিল্ডিং কোডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। ঢাকায় কীভাবে আরো বেশি মানুষের জায়গা দেয়া যায়, সে উদ্দেশ্যেই এসব নীতি ও বিধি করা হচ্ছে। আমরা সবসময় এর বিরুদ্ধে বলে আসছি। ঢাকায় কত ভবন হবে, কত মানুষ থাকবে—এটার সিদ্ধান্ত সরকারকে নিতে হবে। কিন্তু সে বিষয়ে কোনো আলাপ হচ্ছে না, প্ল্যান হচ্ছে না। উল্টো প্রতিদিন হাজারো মানুষ নতুন করে ঢাকায় এসে আশ্রয় নিচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে কোনো প্ল্যানই আসলে কাজে আসবে না।’
Reporter Name 









